সোমবার, ২৯ শ্রাবণ ১৪১৯, ২৪ রমজান ১৪৩৩, ১৩ আগস্ট ২০১২


 
Total Visitor
 
   
 
লিঙ্কস :
ঠিকানা দর্পণ
প্রথম আলো ইত্তেফাক
যুগান্তর আমার দেশ
মানব জমিন সমকাল
কালের কণ্ঠ বাংলাদেশ প্রতিদিন
জনকণ্ঠ ইনকিলাব
যায় যায় দিন আলোকিত বাংলাদেশ
নয়া দিগন্ত আমাদের অর্থনীতি

প্রথম পৃষ্ঠা শেষ পৃষ্ঠা সভা-সমিতি খবর সম্পাদকীয় উপ-সম্পাদকীয় বিশেষ সংখ্যা
উপ-সম্পাদকীয়

বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক সামাজিক দায়বদ্ধতা
আহমদ রফিক

আমাদের প্রিয় পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। বদলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আমরা সবাই পরিবর্তন চাই। সমাজ পরিবর্তন, রাষ্ট্রিক পরিবর্তন নিয়ে কত কথা! এমনকি শপথবাক্য উচ্চারিত হচ্ছে যেমন সংবাদমাধ্যমে, তেমনি টিভির টক-শোতে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আমরা যা চাই তা পাই না, যা চাই না তা-ই পেতে হয়। তাই কষ্টের সঙ্গে দেখতে হচ্ছে বৈশ্বিক পরিবর্তনটা (আসলে ৰমতাসীন বিশ্বের পথচলা) মন্দ থেকে মন্দতর পথে। জীবনানন্দের পৃথিবীর এখন অনেক অনেক 'গভীরতর অসুখ'।
আর ঐ শানত্দিবাদী, বিশ্ব নাগরিকত্বের প্রত্যাশী বুড়োর কথাগুলো বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজনীতির ৰেত্রে ঘুরেফিরে আসে। না চাইলেও আসে। যুদ্ধহীন শানত্দির পৃথিবী গড়ার আকাঙৰা নিয়ে ১৯৪১-এ যার চলে যাওয়া এবং যাওয়ার মাস কয় আগে পশ্চিমা সভ্যতার ভূমিকা, পূর্বদিগন্ত নিয়ে প্রত্যাশা, বিশ্বের শানত্দির আবাস হিসেবে গড়ে ওঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেষ উচ্চারণ-সেসব অনার্জিতই থেকে গেছে। সত্তর বছরে অর্জনের ঘর এদিক থেকে প্রায় শূন্য। সে সময়ের যুদ্ধবিরোধী, শানত্দিবাদী যেমন রঁলা, বাবর্ুস, রাসেল, শ' থেকে রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বুদ্ধিজীবী একটা আন্দোলনের মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন। তবু ফ্যাসিস্ট লোভের তাড়নায় বিশ্বযুদ্ধ ঠিকই শুরু হয়-কোটি মানুষের মৃতু্য বুঝিয়ে দেয় শাসকশ্রেণীর আকাঙৰা কত নির্মম। আর নির্মমতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ জাপান পরাজয় স্বীকারের পরও হিরোশিমা, নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বর্ষণ-ঐ নিষ্ঠুরতার শিকার সাধারণ মানুষ। ইতিহাসের ন্যক্কারজনক অপরাধ ঘটায় আমেরিকা।
এটা কি ছিল পার্ল হারবার আক্রমণের প্রতিশোধ? যা-ই হোক, শানত্দিবাদী বিশ্ব বুদ্ধিজীবী প্রায় সকলেই নিন্দায় মুখর হয়েছিলেন ঐ অমানবিক তৎপরতার বিরুদ্ধে। তিরিশের দশকে স্পেনে স্থানীয় ফ্যাসিস্ট শক্তির গণতন্ত্র ধ্বংস করার তৎপরতা থেকে ষাটের দশকে ভিয়েতনামে মার্কিনি গণতন্ত্রের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন বিশ্বের মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। সংখ্যায় তারা নিত্যন্ত কম ছিলেন না। কিন্তু এখন? বদলে যেতে থাকা পৃথিবীতে অনুরূপ বা অধিকতর গুরুতর অন্যায় ও নরনারী হত্যার ঘটনাবলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের সংখ্যা কেমন? এখন বড় নিঃসঙ্গ তারা। ঘুরেফিরে কয়েকটি নাম শোনা যায়।

ভিয়েতনামে মার্কিনি সেনাবাহিনীর চরম মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বয়সী (জন্ম ডিসেম্বর ১৯২৮) চমস্কিও একজন। বলা হয়ে থাকে, মেধায় ইহুদিদের তুলনা মেলা ভার। এর কারণ কি জনতাত্তি্বক জিনপ্রভাব, না অন্য কিছু? মজার ব্যাপার যে আইনস্টাইনের ঐ জিন পরিচয় জানা থাকলেও অনেকের সম্বন্ধে আমরা কম জানি। যেমন মার্কসবাদী মার্কিনি ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট কিংবা নোয়াম চমস্কি। অথচ এরা যুক্তরাষ্ট্রবাসী হয়েও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকার গভীর সমালোচক। তারুণ্যে চমস্কি ফ্যাসিস্ট শক্তির অন্যায় মহড়া, যুদ্ধবাদিতা, অর্থনৈতিক মন্দা ইত্যাদি ঘোষণার তাত্তি্বক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছিলেন, তার ভাষায় 'শ্রমজীবী শ্রেণীর সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ, সংহতি ও সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ', (উদ্ধৃতি, মিলান রাই 'চমস্কির রাজনীতি', ১৯৯৫। চমস্কি যুক্তসঙ্গত ভাষায় যুদ্ধবাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার সমালোচক ইন্দোচীন ও অন্যত্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অন্যায়-যুদ্ধেরও তিনি বিরোধী। যেজন্য নিঙ্নের কুখ্যাত 'শত্রম্নতালিকায়' তার নাম ওঠে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তার তথ্যনির্ভর ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ তাকে এমন সিদ্ধানত্দে পেঁৗছাতে সাহায্য করে যে ভিয়েতনামে মার্কিনি যুদ্ধ তৎপরতা সিদ্ধান্তগত ভুল নয়। বরং এ যুদ্ধ একটি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গভীর মূলীয় বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্যবাদের হিসাব-নিকাশ করেই এ যুদ্ধে নেমেছিল। আট দশকের দীর্ঘ জীবনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাদী কর্মকাণ্ড দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই চমস্কি তার লেখায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষিত করেন সাম্রাজ্যবাদী (ইম্পিরিয়ালিস্ট) রাষ্ট্র হিসেবে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের বর্বরতা সম্ভবত তার চৈতন্যে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিল। সেজন্য তার লেখায় নানা বিষয়ের আলোচনায় ভিয়েতনাম প্রসঙ্গ উঠে আসে এবং তিনি লেখেন, 'ইন্দোচীন যুদ্ধে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ মারাত্মক ধাক্কার পরাজয় বরণ করেছে।' আর সায়গনে আমেরিকানদের বসানো তাঁবেদার সরকার পতনের পর জাপানি পত্রিকা 'আসাহি সিমবুন' সম্পাদকীয় সত্দম্ভে ঠিকই মন্তব্য করে যে 'সব দিক বিচারে ভিয়েতনাম যুদ্ধ একটি মুক্তিসংগ্রাম। এ যুগে কোনো পরাশক্তির পৰে জাতীয়তাবাদের উত্থান অনির্দিষ্টকাল চেপে রাখতে পারে না।' একজন বুদ্ধিজীবীর নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রকাশে দ্বিধাহীন চমস্কি ওই মন্তব্য সঠিক মনে করেও বুঝতে ভুল করেন না যে, মুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী কিছুটা উচ্চাভিলাষী তো বটেই। কারণ আমরা দেখেছি, এশিয়া, আফ্রিকা বা দৰিণ আমেরিকায় ওয়াশিংটন সমর্থিত সামরিক শাসক দশকের পর দশক তাদের আধিপত্য ও পীড়ন বজায় রেখেছে। তাদের উৎখাত করার কাজ সহজ হয়নি। ইন্দোনেশিয়া, চিলি, ব্রাজিলের মতো একাধিক রাষ্ট্র তার প্রমাণ। এসব ৰেত্রে বুদ্ধিজীবীদের দরকার তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন। আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবীদের দাঁড়াতে হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশে প্রতিবাদী জনমত সংহত করার নৈতিক দায়িত্ব পালনে একমাত্র বিপুল সংখ্যক জনমতই পারে পরাশক্তিকে একসময় তার অন্যায় অবস্থান থেকে পিছু হটায় বাধ্য করতে।
এখানেও সমস্যা আছে। কারণ, মার্কিনি প্রচারযন্ত্র কথিত গণতন্ত্রের নামে নানা কটূক্তিসহ জোর গলায় এমন প্রচার চালায় যে বুদ্ধিজীবীর বা জনসাধারণের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। বিশেষ করে সেখানে যদি থাকে কমিউনিস্ট জুজুর শাসনৰমতা দখল করার ভয়। সাময়িকপত্র এসব ৰেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রায়ই তাদের ভূমিকা চতুর রৰণশীলতার প্রতিফলন ঘটায়। 'নিউইয়র্ক টাইমস' এবং 'ওয়াশিংটন পোস্ট'-এর মতো প্রভাবশালী পত্রিকার ভূমিকা নিয়ে চমস্কি তাই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন ভিয়েতনামে নাৎসী বর্বরতার তুল্যমূল্য মার্কিন আচরণে। হত্যা, পীড়ন, গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করা, নাপাম বোমায় বনাঞ্চল পুড়িয়ে ছারখার করার মতো ঘটনায়। কাগজে এ জাতীয় মর্মানত্দিক ঘটনার বিবরণ ছাপা হয়েছে। মনে পড়ছে, সে সময় কাগজে ছাপা হয়েছিল মার্কিন সেনাদের হাতে ধৃত এক ভিয়েতকং গেরিলার ছবি। নির্বিকার মুখ তরুণ, তার মাথায় পিসত্দল ঠেকিয়ে গুলি করতে উদ্যত এক মার্কিন সেনা। পরবর্তী ঘটনা বলার অপেৰা রাখে না। আশ্চর্য যে তবু বিশ্ববিবেক, বুদ্ধিজীবীর মানবিক চৈতন্য ঐসব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যথেষ্ট সময় নিয়েছে। মার্কিন জনমতের ৰেত্রেও একই কথা খাটে। তাই ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসান বিলম্বিত হয়েছে। হত্যা, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসাত্মক অপরাধের মাত্রা প্রসারিত হয়েছে। বুদ্ধিজীবী বিশেষের কলমে 'মার্কিনি বর্বরতা' শব্দ যুগলের ব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। রাজনীতির টানাপড়েনে বুদ্ধিজীবীর নৈতিক দায়িত্ব পালন বিলম্বিত। তিন যে হতাশা নিয়ে লেখাটা শুরু করেছি, সেখানে ফিরে গেলে মানতে হয় যে শিৰিত এলিট শ্রেণীর মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে, রাজনীতিমনস্ক-সংস্কৃতিমনস্ক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মধ্যে। ক্যারিয়ার সচেতনতার চেয়েও আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এর কারণ। আদর্শবাদের গ্রহণযোগ্যতা এখন অনেক কমে গেছে। হয়তো সমাজতন্ত্রের পিছু হটা ও সমাজবাদী ব্যবস্থার পতন এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। সেই সঙ্গে একক মহাপরাক্রমী পরাশক্তি মার্কিন যুদ্ধরাষ্ট্রের আধিপত্য বিসত্দার, শক্তি ও কৌশলের প্রতিযোগিতাহীন প্রয়োগ বুদ্ধিজীবীদের পাল্টে দিয়েছে। পাল্টে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও ভোগবাদী আদর্শের প্রভাব। আদর্শহীন পাল্টে যাওয়া বা পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টার পেছনে শুভবুদ্ধি কাজ না করারই কথা, বিশেষ করে শক্তির ভারসাম্যহীন পৃথিবীতে। সেখানে মেধাবী বুদ্ধিজীবীদের দেখা যাচ্ছে মহা পরাশক্তির সমর্থনে সুর মেলাতে বা তার কাজের প্রতি নীরব সমর্থন জানাতে। সেখানে বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক-সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি বিশ্বাস কমে আসছে। হয়তো তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ক্রমে বিরল থেকে বিরলতর হতে দেখা যাচ্ছে। ইতিহাস তৈরির পেছনে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবীর চেয়ে নীরব বা ইতিহাস তৈরির পেছনের দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবীর সংখ্যাই যেন তুলনায় বেশি। এক পৃথিবীতে একক শক্তির প্রতীক ন্যাটো তাই অনায়াসে যুক্তিহীন সামরিক তৎপরতায় লিপ্ত হতে পারে। যেমন পেরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি বেস্নয়ার ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ রাষ্ট্র প্রধানগণ জনবিধ্বংসী অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করতে ইরাক আক্রমণ করে। ঐ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেমন ছিল বুদ্ধিজীবীদের সংঘবদ্ধ ভূমিকা? প্যান্ডোরার বাঙ্ খুলে দেওয়া হলে তাতে লাখ লাখ লোকের মৃতু্য ও ঐতিহ্যবাহী বাগদাদ জাদুঘর লুটপাট ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বিরল ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। সেখানে বসানো হলো পুতুল সরকার সাদ্দাম হত্যার মধ্য দিয়ে। শুরু হলো শিয়া-সুনি্ন সংঘাত, সেই সঙ্গে কুর্দিদেরও যোগদান। সেই হানাহানি ও রক্তস্রোত এখনো বন্ধ হয়নি মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পরও। অতিদ্রম্নত জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে সে আগ্রাসন। জনবিধ্বংসী অস্ত্র একটিও পাওয়া যায়নি কিন্তু স্বার্থসিদ্ধ হয়েছে ইঙ্গ মার্কিন সামরিক জোটের। ইরাকের বিশাল তেলভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ হাতে চলে এসেছে। মনে করে দেখা যাক, সেই বর্বরতার বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের তুলনায় কেমন প্রতিবাদ, উচ্চারিত, কতটা বলিষ্ঠ প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিল তখন? ব্রিটেন-আমেরিকায় প্রতিবাদী সভা-শোভাযাত্রার মাত্রা কতটা আকাশ ছুঁয়েছিল? তবু ব্যতিক্রমী বিবেকবান মানুষের কণ্ঠে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে যদিও তা ফলপ্রসূ হয়নি। প্রসঙ্গত সার্বিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণের (মার্চ-১৯৯৯) কথা উল্লেখ করে নোয়াম চমস্কি লিখেছেন, 'ন্যাটোর সার্বিয়ায় বোমাবর্ষণের মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটল।' ন্যাটোর পৰে বুদ্ধিজীবী সমর্থনের অভাব ঘটেনি। চমস্কি একটু খোলামেলাভাবেই লিখেছেন : 'কসোভোতে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন : তাই হসত্দৰেপ। ন্যাটোর বোমাবর্ষণ। তার মতে, এর ফলাফল জাতিগত বিবেচনায় মোটেই ভালো হয়নি এবং ২০০০ সালে জি-৭৭ শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় স্পষ্ট করেই মানবিক অধিকার রৰার নামে ন্যাটোর এ ধরনের হসত্দৰেপ অনধিকার চর্চা বলে চিহ্নিত করা হয়। এপ্রিল ২০০০ সালে সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেলসন ম্যান্ডেলা ব্রিটেন সফরকালে ন্যাটোর এ ধরনের ক্রিয়াকলাপ উপলৰে ইঙ্গ-মার্কিন সরকারকে আন্তর্জাতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে অভিযুক্ত করেন। তিনি বিশেষভাবে ব্রিটেন ও আমেরিকাকে অন্যান্য রাষ্ট্রের মতামত উপেৰা করে ইরাক ও কসোভোতে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য তার ৰোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক মতামতের বিরুদ্ধে এ ধরনের কার্যকলাপ বিশ্বশানত্দির পৰে বিপজ্জনক। শিবির-বিভাজিত এবং বিশ্বশানত্দির পৰে সদর্থক ভূমিকা পালনে পিছিয়ে। একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার মর্জিমতো যখন তথাকথিত 'নতুন যুগ' 'নতুন বিশ্ব বিধান' তৈরি করে বিশ্ব শাসনে ব্যসত্দ, তখন সেই 'পুলিশি' শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সাহসীর সংখ্যা নগণ্য। লেখক-বুদ্ধিজীবী যে সোলঝেনেৎসিন রুশী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, সে প্রতিবাদে বোধহয় সততার অভাব ছিল, অভাব ছিল আদর্শগত চেতনার। তাই ইঙ্গ-মার্কিন পরাশক্তির অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয় না। বরং নববিধানের পৰে বিভ্রানত্দিকর ব্যাখ্যা হাজির করেন তিনি। শেষোক্ত মন্তব্য আমার নয়, নোয়াম চমস্কির। অবশ্য মনে একটু খুঁতখুঁতানি জাগে, যখন দেখি সার্বিয়া, কসোভোয় ইঙ্গ-মার্কিন ভূমিকা নিয়ে, ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে চমস্কি সমালোচনায় অস্থির, কিন্তু তুলনামূলকভাবে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলি স্বেচ্ছাচার ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তার বক্তব্য ততটা বলিষ্ঠ নয়। পাক-আফগান অঞ্চলে ন্যাটোর ড্রোন হামলায় বেসামরিক নারী-পুরুষ-শিশু মৃতু্যর নিয়মিত ঘটনায় তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। ইরাক ও তুরস্ককে ঘিরে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে বিশ্ব বুদ্ধিজীবীদের সোচ্চার হতে শোনা যায় না, বিশেষ করে তাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অমানবিকতার বিষয়ে। কুর্দিদের স্বশাসনের আন্দোলন দীর্ঘদিনের। ইরাক অভিযানের পর কুর্দিদের সমর্থন পেতে তাদের সামনে রাখা টোপ ঝুলিয়ে দেয় ইঙ্গ-মার্কিন আক্রমণকারী শক্তি। সাদ্দামকে শেষ করতে তাদের সাহায্য দরকার ছিল। ইরাকে বসানো পুতুল সরকারের প্রেসিডেন্ট কুর্দি হওয়া সত্ত্বেও কুর্দি সমস্যার সমাধান হয়নি তাদের প্রত্যাশামাফিক। কুর্দিদের পৰে প্রতিশ্রুত কতটা সাহায্য দিয়েছে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি? এ ব্যাপারে কামাল পাশার তুরস্ক সামান্য গণতান্ত্রিক ভূমিকাও পালন করতে পারেনি। মানেনি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের তথা স্বশাসনের অধিকার। দুর্বল অর্থনীতির মধ্যেও বিস্ময়কর সত্য যে, তুরস্ক মার্কিনি অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক উপকরণের একক সর্ববৃহৎ ক্রেতা। আর এই অস্ত্র সরঞ্জামের অধিকাংশই ব্যবহৃত হচ্ছে কুর্দিদের বিরুদ্ধে। মার্কিনিরা একসময় কুর্দি দমনের অভিযোগ এনেছিল ইরাকি শাসক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে। কিন্তু তুরস্কের ব্যাপক কুর্দি হত্যা অনাচার সম্বন্ধে ওয়াশিংটন নিশ্চুপ। অবশ্য এ বিষয়ে চমস্কির তীর্যক মন্তব্য প্রশংসনীয়। তার ভাষায়, 'ধন্যবাদ, যুক্তরাষ্ট্রের ভারী অস্ত্রশস্ত্র কামান গোলা, সামরিক প্রশিৰণ ও কূটনৈতিক সমর্থনের জন্য, যার ফলে তুরস্ক কুর্দি প্রতিরোধ ভেঙে ফেলতে সৰম হয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে কুর্দিদের বিরুদ্ধে এই যে অমানবিক আগ্রাসন চলছে, তার বিরুদ্ধে বিশ্ব বুদ্ধিজীবীর প্রতিবাদী কণ্ঠ বড় একটা শোনা যাচ্ছে না। ব্যতিক্রম চমস্কি। তার হিসাবে তুর্কি অভিযানে নিহত কয়েক লাখ কুর্দি, ২০-৩০ লাখ উদ্বাস্তু, ৩৫০০ কুর্দিগ্রাম ধ্বংস। তবু চুপচাপ বিশ্ব বিবেক। চার বিশ্ব শানত্দিরৰার পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে চাই না। কারণ তাহলে ইঙ্গ-মার্কিন অনাচারের অনেক কাহিনী উঠে আসবে। উল্লেখ করতে হবে সেই পঞ্চাশের দশক থেকে এ যাবৎ ঘটানো ইঙ্গ-মার্কিন অনাচারের সাতকাহন। ইরান, ইন্দোনেশিয়া, চিলি, গুয়াতেমালা, কঙ্গো থেকে কলম্বিয়া, অ্যাঙ্গোলা, নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলোতে পরোৰ কী রক্তপাতই না ঘটিয়েছে ঐ পরাশক্তিদ্বয় ও তাদের মিত্ররা। ঘটনাক্রমে কয়েকটি রাষ্ট্র তাদের মুঠো ফসকে বেরিয়ে গেছে, যেমন ইরান বা নিকারাগুয়া। ইরান এখন তাদের মহাশত্রম্ন। শত্রম্ন ইসরাইলের। তাই তাকে শায়েসত্দা করার আয়োজন চলছে। ইতোমধ্যে গাদ্দাফির মতো খতমের কাজ সুন্দরভাবে চলেছে। এখন তা চলছে সিরিয়ায়। অসন্তুষ্ট জনতা বা বিদ্রোহী গ্রম্নপকে উসকে দেওয়া এবং তাদের অস্ত্র, অর্থ, ৰেত্রবিশেষে প্রশিৰণ দেওয়া তো ইঙ্গ-মার্কিনিদের বিশ্ব ষড়যন্ত্রের চিরাচরিত আলোচ্য। ঐ পঞ্চাশের দশকে পাকিসত্দানকে কবজা করা তাদের, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক প্রয়োজনের অংশ ছিল। পাকিসত্দানের বর্তমান রাজনৈতিক দুর্দশার দায়তো বিদেশ-শক্তি হিসেবে ওয়াশিংটনকেই নিতে হবে। তালেবান তৈরির ঘটনা ও দায়দায়িত্ব সবারই জানা। বিশ্বজুড়ে ইঙ্গ-মার্কিন বিশেষভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই যে আধিপত্যবাদী ও কূটনৈতিক কুতৎপরতা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো একক সামরিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রের আছে বলে মনে হয় না। কিছুটা শক্তি যার বা যাদের আছে পরিস্থিতি এখন তার বা তাদের চৈনিক শক্তি সম্বন্ধেও ওয়াশিংটন সজাগ। সজাগ বলেই মিয়ানমার সম্পর্কে পেন্টাগনের এত ভাবনা, সু চির পাকিসত্দানকে ধরে রাখা সবকিছুর পেছনে উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হচ্ছে স্থলপথে সমুদ্রপথে চীনবিরোধী দেয়াল তৈরি করা। এ ৰেত্রে বাংলাদেশকেও তাদের দরকার। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরৰামন্ত্রীর বক্তব্যে থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। মার্কিন রণনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ভারত মহাসাগরে বঙ্গোপসাগরে নৌ-সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা। সামরিক সমাধান সহজ নয় বলেই বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর দায়দায়িত্ব বেড়ে যায়। সেটা আরো বাড়ে, যখন আধিপত্যবাদী পরাশক্তি আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির লৰ্যে মিথ্যা প্রচারে নামে এবং অনেকে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে। অবশ্য বুদ্ধিজীবীর দায়িত্বপালন সঠিক তথ্যের ওপর। নির্ভর করে, রাজনৈতিক প্রয়োজনে মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে এবং তার দায়দায়িত্ব শুধু সংস্কৃতি অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকে না। কারণ সংস্কৃতিচর্চা শুদ্ধ সংস্কৃতিরই বিষয় নয়। তার ওপর গভীর ছায়া পড়ে, প্রভাব পড়ে রাজনীতির। তাও আবার তৃতীয় বিশ্বের ৰেত্রে পড়ে শক্তিমান বিশ্ব রাজনীতির। আগে তবু কখনো কখনো নিরপেৰ অবস্থান নিয়ে একপাশে সরে থাকার চেষ্টা হয়তো করা যেত কিন্তু এখন বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির কল্যাণে কার সাধ্য দূরে সরে থাকে? স্বদেশের বলে কথা নয়, বিশ্ব পটভূমিতে অন্যের ওপর অন্যায় আগ্রাসনের পটভূমিতে প্রতিবাদ বুদ্ধিজীবীর জন্য আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক হয়ে দাঁড়ায়। সে ৰেত্রে রাজনৈতিক আদর্শ প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি হোক বা না হোক অন্ততপৰে মানবিক আদর্শ নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক আদর্শের টানাটানিতে কয়েক দশক আগে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিভাজন কম হয়নি। নিরৰরেখায় দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবীও তখন সেই আদর্শিক দ্বন্দ্বে যোগ দিয়েছে। তাদের ঝোঁক দেখা গেছে কথিত গণতন্ত্রের দিকে তা সে গণতন্ত্রের বাসত্দব রূপে দেখা গেছে মিলুক বা না-ই মিলুক। পাঁচ একদা ঔপনিবেশিক বিশ্বের োগান-'রুল ব্রিটানিয়া, রুল' সময়ের সাগরে ভেসে গেছে। একুশ শতকের নতুন োগান বিশ্বজুড়ে 'রুল আমেরিকানা, রুল'। বিশ শতককে একসময় বলা হয়েছে, 'আমেরিকান শতক'। সেটাই কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র চলে-বলে-কৌশলে। তার 'সাম্রাজ্যবাদী মহানীতি' এখন অপরাজেয় হয়ে উঠেছে। আগেই বলেছি, এককভাবে কোনো রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সাধ্য নেই তাকে পরাজিত করে। উপায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির ঐক্য-সেখানেও সামরিক সংঘাত কৌশল হিসেবে বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। অন্যদিকে কারো কারো বিবেচনায় 'জনমত' বলিষ্ঠ, ঐক্যবদ্ধ জনমত দানব পরাশক্তির আগ্রাসন ঠেকাতে হয়ে উঠতে পারে বিকল্প 'পরাশক্তি'। ইতিহাস পাঠক হয়রান 'মনরো ডকট্রিন' 'রিগ্যান ডকট্রিন' 'ক্লিনটন ডকট্রিন' এমনকি 'বুশ ডকট্রিন'-এর কথা শুনতে শুনতে। আর হতাশ বিশ্বের সর্বত্র তাদের প্রয়োজনমতো নাক গলানো দেখে। এবার তা কখনো শানত্দির নামে, কখনো গণতন্ত্র রৰার উপলৰে। এ ইতিহাস মার্কিনি গণতন্ত্রের ইতিহাস, বিসত্দারিত উদ্ধৃতিতে তা প্রমাণ করা সম্ভব। আর এসব কারণেই বিকল্প পরাশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করতে মানবিক চেতনায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীর দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। সাম্রাজ্যবাদকে ঠেকাতে হবে ভেতর থেকে, বাইরে থেকে। এক শতাংশের অন্ধশাসনের বিরুদ্ধে নেপথ্য শক্তি যে সচেতন হতে শুরু করেছে তার প্রমাণ 'ওকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন' যদিও সুষ্ঠু নেতৃত্বের অভাবে তা এখন সত্দব্ধ। আর সে জন্যই 'জনমত' শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করা, সঠিক দিকনির্দেশনার দায় বুদ্ধিজীবীদেরই নিতে হবে।

অন্যান্য শিরোনাম

বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক সামাজিক দায়বদ্ধতা
আহমদ রফিক